
আইনেট প্রতিনিধিঃ প্রতি বছর ৭ অক্টোবর বিশ্ব তুলা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি দেশের ভবিষ্যতের মজবুত ভিত অনেক সময় গড়ে ওঠে তার অতীতের ঐতিহ্যের ওপর নির্ভর করেই। হাজার হাজার বছর ধরে ভারতে তুলা থেকে সুতো তৈরি এবং কাপড় বোনার ঐতিহ্য চলে আসছে। ভারতীয় মসলিনের সূক্ষ্মতাএতটাই অসাধারণ ছিল যে, একসময় তাকে বলা হতো ‘বাতাসে বোনা কাপড়’। তাই ভারতের কাছে তুলা কখনও শুধুই একটি কৃষিপণ্য নয়। দেশের সভ্যতা, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় অগ্রগতির সঙ্গে তুলা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
আজ সেই ঐতিহ্য আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে। তুলা উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ভারত। আর তুলা চাষের জমির পরিমাণের নিরিখে ভারত বিশ্বের বৃহত্তম দেশ। দেশে প্রায় ১১৫.২৫ লক্ষ হেক্টর জমিতে তুলা চাষ হয়, যা বিশ্বের মোট তুলা চাষের জমির এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। বাণিজ্যিকভাবে তুলার চারটি প্রজাতিই চাষ হয় একমাত্র ভারতেই। দেশের প্রায় ৬০ লক্ষ কৃষক সরাসরি এই ফসলের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি তুলা থেকে বীজ ও আঁশ পৃথক করা, সুতো তৈরি, কাপড় বোনা এবং পোশাক উৎপাদনের মতো বিভিন্ন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন আরও লক্ষ লক্ষ মানুষ।
তুলা আজও ভারতের ‘সাদা সোনা’। এই ফসল লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা, শিল্পের শক্তি এবং গ্রামীণ সমৃদ্ধির অন্যতম উৎস। দেশের বস্ত্রশিল্পে ব্যবহৃত মোট তন্তুর প্রায় ৬০ শতাংশই আসে তুলা থেকে। বিশ্বে এই হার প্রায় ৩০ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান ভারতের তুলা-নির্ভর বস্ত্রশিল্পের ব্যাপকতা ও শক্তির পরিচয় দেয়। তবে এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আমাদের দায়িত্বও—প্রতি হেক্টর জমিতে উৎপাদন বাড়ানো, তুলার প্রতিটি গাঁটের গুণমান উন্নত করা এবং কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা।
দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের তুলাশিল্পকে নানা সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়েছে। কম উৎপাদনশীলতা, বৃষ্টিনির্ভর চাষের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, জলবায়ু পরিবর্তন ও কীটপতঙ্গের ঝুঁকি, আধুনিক প্রযুক্তির অসম প্রাপ্যতা এবং তুলার গুণমান নিয়ে উদ্বেগ—সব মিলিয়ে এই ক্ষেত্রের অগ্রগতির পথে একাধিক বাধা ছিল।
প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে এই পরিস্থিতিতে যে পরিবর্তন এসেছে, তার মূল বৈশিষ্ট্য হল উদ্যোগের ব্যাপকতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং সমন্বিত পরিকল্পনা। এখন তুলা উৎপাদনকে শুধু কৃষিক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বীজ ও কৃষক থেকে শুরু করে তুলা থেকে বীজ ও আঁশ পৃথক করা, সুতো তৈরি, উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাজার পর্যন্ত সম্পূর্ণ উৎপাদনশৃঙ্খলকে একসঙ্গে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই লক্ষ্যেই ৫,০০০ কোটি টাকারও বেশি বরাদ্দ নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে তুলা উৎপাদনশীলতা মিশন—‘কাপাস ক্রান্তি’। এর লক্ষ্য স্পষ্ট—২০৩০-৩১ সালের মধ্যে প্রতি হেক্টরে তুলার আঁশের উৎপাদন ৪৪০ কেজি থেকে বাড়িয়ে ৭৫৫ কেজিতে নিয়ে যাওয়া এবং তুলার মোট উৎপাদন ৪৯৮ লক্ষ বেলে উন্নীত করা। এই মিশনের আওতায়জলবায়ু-সহনশীল ও উচ্চ ফলনশীল জাতের তুলা, আধুনিক কৃষিপদ্ধতি, কৃষকদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনী, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, গুণমানের উন্নতি, পরীক্ষার ব্যবস্থা, উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত পণ্যের উৎস ও গতিপথশনাক্তকরণ এবং পরিবেশবান্ধব তন্তু উৎপাদনের মতো বিষয়গুলিকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।